বর্তমান সময়ে চারিদিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জয়জয়কার। আধুনিক এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ অনেক জটিল কাজ সহজেই করে ফেলছে। এআই দিয়ে নানা ধরনের কাজকর্ম করা বেশ কয়েক বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। তবে বর্তমানে এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করার বিষয়টি ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এআই ভিডিও কি
এআই শব্দটির পূর্ণরূপ হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (artificial intelligence)। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জটিল কাজ মুহূর্তেই করে ফেলা যায়। আর এআই ব্যবহার করে ভিডিও ক্লিপ তৈরি করলে সেটাকেই বলা হয় এআই ভিডিও। অর্থাৎ কোন ক্যামেরা দিয়ে দৃশ্য ধারন না করে শুধুমাত্র যান্ত্রিকভাবেই মানুষসহ নানার দৃশ্যের ভিডিও তৈরি করা যায় এই প্রযুক্তির সাহায্যে।
এর জন্য প্রয়োজন একটি স্ক্রিপ্ট বা ধারণা। যেটিকে আমরা প্রমট Prompt বলে থাকে। অর্থাৎ ভিডিওটি কত সেকেন্ডের হবে, কি কি দৃশ্য থাকবে, ভয়েস কেমন হবে, ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন হবে, চরিত্র কেমন দেখাবে ইত্যাদি লিখে দিলেই সে অনুযায়ী ভিডিও তৈরি হয়ে যায়। ইতিমধ্যে ফেসবুক, ইউটিউব সহ নানা ধরনের প্লাটফর্মে বেশ এআই ভিডিও দেখা যাচ্ছে।
এআই ভিডিও আবার কয়েক ধরনের হয়ে থাকে
১। টেক্সট টু ভিডিও (Text to Video)
এর মাধ্যমে ভিডিও সম্পর্কিত বিষয় টেক্সট আকারে লিখে দিতে হয়। তারপর এআই টুল সেই টেক্সট অনুযায়ী ভিডিও তৈরি করে দেয়।
২। ইমেজ টু ভিডিও (Image to Video)
এর মাধ্যমে এআইকে একটি ছবি দিতে হয় এবং সেই ছবি থেকে ভিডিও তৈরি কাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এআই করে দেয়।
৩। ডিপফেক ভিডিও (Deepfake Video)
এর মাধ্যমে যেকোনো একটি দৃশ্যে থাকা মানুষের মুখ বা অন্যান্য বিষয় পরিবর্তন করে নতুন ভিডিও তৈরি করা হয়। যেমন কোন সিনেমার দৃশ্য, বিজ্ঞাপনের দৃশ্য ইত্যাদিতে মূল চরিত্রে মুখে জায়গায় অন্য কোন চরিত্রকে বসিয়ে দেওয়া যায়।

এআই দিয়ে ভিডিও বানানোর সহজ প্রক্রিয়া
বর্তমানে শিক্ষামূলক বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট, মার্কেটিং ইত্যাদি কাজে ব্যাপক পরিমাণে এআই ভিডিওর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কার অন্যতম কারণ হচ্ছে সহজলভ্যতা এবং সময় সাশ্রয়ী। যেখানে ক্যামেরা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও দৃশ্য ধারণ করা বেশ কঠিন ব্যাপার, সেখানে ঘরে বসে এইমাত্র কয়েক সেকেন্ডে একটি ভিডিও তৈরি করা যায়। যারা কিনা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর অর্থাৎ ফেসবুক ইউটিউবের জন্য ভিডিও তৈরি করেন তাদের জন্য এটি আরো বেশি প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী।
অনেকেই আবার শখের বসে সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমে গুলোতে আপলোড করার জন্য এই এআই ভিডিও তৈরি করার উপায় জানতে চান। চলুন সে সম্পর্কে খুঁটিনাটি যায়নি।
প্রথমে স্ক্রিপ্ট তৈরি করুন
সাধারণত মানুষ এআই দিয়ে ভিডিও বানানোর জন্য আগে স্ক্রিপ্ট তৈরি করে নেয়। এই স্ক্রিপ্ট তৈরি করার জন্য আবার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্য নেওয়া যায়। তবে সেটা যাই হোক না কেন প্রথমে গুছিয়ে একটি স্ক্রিপ্ট লিখতে হবে। সেখানে অবশ্যই কিছু বিষয় উল্লেখ থাকতে হবে যেমন
• ভিডিওটি কত সেকেন্ডের হবে
• ব্যাকগ্রাউন্ড দৃশ্য থাকবে
• ভয়েস ছেলে নাকি মেয়ের সেটি উল্লেখ থাকতে হবে
• কোন ধরনের চরিত্র থাকবে
• আশেপাশের দৃশ্যগুলি কেমন হবে ইত্যাদি।
আমি সহজ একটি উদাহরণ দিচ্ছি। এক্ষেত্রে আমি এমন একটি ভিডিও তৈরি করতে চাই যেখানে একটি শিশু খেলনা দিয়ে খেলা করছে। এক্ষেত্রে কমান্ড বা প্রমটটি হবে ” a child playing with toys”। এর সাথে আরও খুটিনাটি বিষয় লিখে দেওয়া যেতে পারে। যেমন শিশুটির বয়স কেমন হবে। দৃশ্য কেমন হবে ইত্যাদি।
পছন্দমত AI Tools বেছে নিন
Command রেডি হয়ে গেলে এবার কোন প্লাটফর্ম থেকে ভিডিও তৈরি করে নিবেন সেটি নির্ধারণ করে নিতে হবে। বর্তমানে অনেক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট রয়েছে যেগুলো হতে আপনি এআই ভিডিও বানিয়ে নিতে পারেন। তবে এর বেশিরভাগই পেইড সার্ভিস। অর্থাৎ ভালো মানের এবং দীর্ঘ সময় ভিডিও তৈরি করে নিতে টাকা দিয়ে প্যাকেজ কিনতে হবে।
তবে ফ্রী কিছু তথ্য আছে যেগুলো দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক বা নির্দিষ্ট সময়ের ভিডিও তৈরি করা যায় সম্পূর্ণ ফ্রিতে। নিচে তার একটি তালিকা দেওয়া হলো।
- Google Veo 3
- Pictory
- Lumen5
- Invideo
- Steve.Ai
- Hygen
- Capcut (Bytedance)
- Veed.io
প্ল্যাটফর্মে Prompt ইনপুট দিন
সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট এবং আনুষঙ্গিক বিষয় তৈরি হয়ে গেলে আপনাকে নির্ধারিত প্লাটফর্মে গুলোর সাবমিট করতে হবে। এর জন্য উপরে উল্লেখিত যেকোনো একটি এআই টুল বা ওয়েবসাইট বেছে নিতে পারেন। মনে রাখবেন প্রতিটি প্লাটফর্ম থেকেই সার্ভিস গ্রহণ করার জন্য অবশ্যই একটি একাউন্ট খুলে নিতে হবে।
অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টের মত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ওয়েবসাইট বা অ্যাপ গুলোতেও একাউন্ট খোলা খুব সহজ। এর জন্য প্রয়োজন হতে পারে একটি ইমেইল জিমেইল, ফোন নাম্বার, নাম, পাসওয়ার্ড সহ আরো কিছু তথ্য।
ভয়েস ব্যাকগ্রাউন্ড ভিজুয়াল
সাধারণত Promot বা কমান্ড সাবমিট করার পর এই অনেক টুলে আপনাকে নির্ধারিত ভয়েস, ক্যারেক্টার, Music, Language ইত্যাদি পছন্দ করার সুযোগ দিবে। এমনকি যে টুলগুলোতে বাংলা ভাষার সাপোর্ট করে সেই টুল দিয়ে এআই দিয়ে ভিডিও বানানোর সময় বাংলা ভাষা পছন্দ করতে পারবেন। এতে করে সম্পূর্ণ ভিডিও তৈরি হবে বাংলায়।
ভিডিও জেনারেট করুন
সম্পূর্ণ প্রসেসটি শেষ হয়ে গেলে জেনারেট বাটনে চাপ দিন। সাইট ভেদে ভিডিও তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। অনেক সাইট আছে যারা কিনা সম্পূর্ণ ফ্রিতে পুরো ভিডিও দিবে না। এই সাইট হতে পুরো সার্ভিস নেওয়ার জন্য প্যাকেজ কিনতে হয়।
তাই ভিডিও তৈরি করার আগে তাদের প্যাকেজ এবং প্রাইসিংটা দেখে নিতে পারেন। তবে অনেক ফ্রি সাইটও রয়েছে যেগুলোর কথা আমি উপরে ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। এআই ভিডিও তৈরি হয়ে গেলে সেটি আপনি ইচ্ছামত ইউটিউব ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে ব্যবহার করতে পারবেন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এআই দিয়ে ভিডিও বানানোর সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন সেখানে কোন ভুয়া অথবা বিভ্রান্তিকর কোন কিছু না থাকে। একই সাথে কোন ছবি ব্যবহার করে যখন ভিডিও তৈরি করবেন তখন কপিরাইট ছবি ব্যবহারে সাবধানতা জরুরী। অর্থাৎ অনুমতি ছাড়া আরেকজনের ছবি কখনোই ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে করে আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন।
আর ভিডিও গুলো যদি ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে আপলোড দিতে চান তাহলে তাদের নীতিমালা অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে। তা না হলে চ্যানেল বা পেইজে বাধ্যবাধকতা আসতে পারে।
এআই দিয়ে ভিডিও কোয়ালিটি বৃদ্ধি
অনেক সময় আমাদের মোবাইলে কিংবা ক্যামেরায় ধারণ করার দৃশ্যের কোয়ালিটি বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে। যেহেতু ম্যানুয়াল সফটওয়্যার দিয়ে এ কাজ করা খুবই কঠিন এবং প্রফেশনাল ভিডিও এডিটরের প্রয়োজন পড়ে। তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সাহায্যে মুহূর্তেই এই ধরনের কার্য করা যায়। নিচে আমি এমন কিছু টুলসের তালিকা দিচ্ছি যেগুলো দ্বারা নিজেরাই এআই দিয়ে ভিডিও কোয়ালিটি বৃদ্ধি করতে পারবেন।

এআই ভিডিও চেনার উপায় কি
আমি আগেও একবার উল্লেখ করেছি বিভিন্ন প্লাটফর্মে এখন এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও বেশ দেখা যাচ্ছে। যাদের কিনা প্রযুক্তি বিষয়ে অনেক বেশি ধারণা নেই তারা অনেককেই কনফিউজড হয়ে যান এ ব্যাপারে। কোন ভিডিও গুলো কম্পিউটারে বা প্রযুক্তির সাহায্যে করে এবং কোনগুলো বাস্তবিক দৃশ্য তার পার্থক্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এআই ভিডিও চেনার উপায় জেনে নিন এবং সহজেই এআই ভিডিও চেনুন।
১। মুখের চলাচল অস্বাভাবিক
প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ভিডিওগুলোতে মুখের চলাচল বেশ অস্বাভাবিক থাকে। এ সময় দেখা যায় মুখে ঠোঁটের চলাচল খুবই ধীরগতি সম্পন্ন এবং চোখের পলক একদমই পড়ে না। তাছাড়া ও মুখের এক্সপ্রেশনের সাথে অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি গুলো মেলেনা।
২। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড
এআই ভিডিও চেনার অন্যতম উপায় হচ্ছে ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পেছনের অংশ ধোঁয়াটে হয় এবং অস্পষ্ট হয়। হঠাৎ করেই পেছনের অংশ অর্থাৎ ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন হয়ে যায় এবং সেখান থেকে কোন বস্তু গায়েব হয়ে যায়।
৩। কথার সাথে ভিডিওর ভারসাম্যহীনতা
কথা বলার সময় শব্দের সাথে ঠোঁটের মিল থাকে না। একজন মানুষ কথা বললে তার কন্ঠের ভিতর যে আবেগ বা অনুভূতি থাকে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে সেই আবেগটা থাকে না। বরং কথা অনেক বেশি কৃত্রিম শোনা যায়।
৪। হাতের দিকে লক্ষ্য করুন
এআই ভিডিও চেনার উপায় গুলোর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হাত এবং আঙুলের গঠন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি ঠিকমতো হাত এবং হাতের আঙ্গুল তৈরি করতে পারেনা। অনেক সময় আঙ্গুলের সংখ্যা কম বা বেশি অথবা অস্বাভাবিক দেখায়।
৫। চোখের দিকে লক্ষ্য করুন
একটা কথা প্রচলিত আছে যে চোখ যে মনের কথা বলে। মানুষের মনের অভিভক্তি ফুটে উঠে তার চোখে মুখে। কিন্তু যন্ত্রের সাহায্যে মানুষের ভিডিও তৈরি করলে সেই অভিভক্তি ফুটে উঠে না। খেয়াল করে দেখবেন যে ভিডিওতে চোখের দৃষ্টি অপলক ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকে কিংবা চোখের কোন নড়াচড়া নেই সেটি এ আই দিয়ে তৈরি ভিডিও। অনেক সময় দুটি চোখের সাইজের ব্যবধান ও লক্ষ্য করা যায়।
৬। বিভিন্ন ধরনের টুলস দিয়ে চেক করুন
উপরে আমি এআই ভিডিও চেনার উপায় গুলি আলোচনা করেছে সেগুলো আপনার নিজে যাচাই করতে হবে। এছাড়াও অনলাইনের বিভিন্ন ওয়েবসাইট হতেও যাচাই করতে পারবেন কোন ভিডিও গুলো এই আইডি দিয়ে তৈরি। নিচের তার কয়েকটি উল্লেখ করলাম।
• Hive.ai
• Deepware Scanner
• Deepfake O Meter
• Sensity.ai
সবশেষে এটা বলতে পারি মানুষ এবং তার স্বাভাবিক পরিবেশকে যেভাবে দেখায় এ আই ভিডিও ঠিক কখনোই সেভাবে দেখাবে না। কোন একটা কিছুতে অবশ্যই গরমের লক্ষ্য করতে পারবেন। হয়তো পূরণের পোশাক আশাক চুল ইত্যাদিতেও অসঙ্গতি থাকতে পারে।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ
আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে এআই দিয়ে ভিডিও বানানোর উপায় এবং এই ভিডিও চেনার পদ্ধতিগুলি কি। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আগামীতে বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও, শর্ট ফিল্ম, এমনকি সিনেমার অংশগুলো এই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হবে। তাই নিজেকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি করতে এ আই প্রযুক্তি শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন প্রযুক্তির এই অবদান কোনভাবে যেন অনৈতিক এবং মানুষের ক্ষতির কাজে ব্যবহার না করা হয়। আমাদেরকে অবশ্যই সত্যতা সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতার দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরী।
