তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির যুগে লেনদেনের পদ্ধতিও অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। আগে যেখানে শুধুমাত্র নগদ অর্থ আর ব্যাংক চেকের মাধ্যমে টাকা আদান প্রদান করা হতো সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে ইলেকট্রনিক মানি। তাই ধারাবাহিকতায় আজকে আমি আলোচনা করব সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পাওয়ারর উপায়। অর্থের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক লেনদেন সহ নানাবিধ সুবিধা থাকায় বর্তমানে এটি অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম সিটি ব্যাংক। অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মত এটি ও গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের কার্ড সুবিধা প্রদান করে। সহজেই অর্থ লেনদেন, জমা, উত্তোলন ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করার জন্য সিটি ব্যাংক বেশ কয়েকটি ক্রেডিট কার্ড লঞ্চ করেছে। এগুলোর মাধ্যমে যে কেউ চাইলেই ক্যাশ উত্তোলন, পণ্য ক্রয়, বিল পেমেন্ট শপিং ইত্যাদি সুবিধা পেতে পারে। আজকে আমরা জানবো সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা ও এটি কিভাবে পেতে পারেন তার সম্পর্কে।
সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড কি | City Bank Credit Card
শুরুতেই ক্রেডিট কার্ডের সংজ্ঞা জানা প্রয়োজন। এটি এমন একটি কার্ড যার মাধ্যমে যখন তখন ক্যাশ উত্তোলন করা যায়, বিল পেমেন্ট করা যায় এবং শপিং করা যায়। উপরিক্ত কাজগুলি অন্যান্য কার্ডের মাধ্যমেও করা যায়। যেমন ভিসা কার্ড, ডেবিট কার্ড ইত্যাদি। তবে ক্রেডিট কার্ডের বিশেষ সুবিধা হচ্ছে একাউন্টে কোন টাকা না থাকলেও অর্থ খরচ করা যায়।
ধরুন আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স শূন্য। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডের সাহায্যে চাইলেই নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থ খরচ করতে পারবেন। কার্ডের ধরন অনুযায়ী এই লেনদেনের সীমা ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সকল ব্যাংকের কার্ডের নিয়ম কানুন মোটামুটি একই ধরনের। তবে সিটি ব্যাংক সহ অন্যান্য ব্যাংক গ্রাহকদেন জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা দিয়ে থাকে।
সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার নিয়ম কি
যেহেতু এই কার্ডের স্পেশাল কিছু সুবিধা রয়েছে তাই এটি পাওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত মানতে হয়। যেকোনো ব্যাংকে একাউন্ট ওপেন করলেই ভিসা, ডেবিট কার্ড ইত্যাদি পাওয়া যায়। কিন্তু এই ক্রেডিট কার্ড সহজে পাওয়া যায় না। তবে আপনার প্রয়োজনে কিভাবে এটি পেতে পারেন চলুন শেষ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।
ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার উপায়
• কার্ডের জন্য আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই নূন্যতম ১৮ বছর হতে হবে। এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭০ বছর।
• আবেদনকারী নিজের ভোটার আইডি কার্ড থাকতে হবে।
• ইনকাম সোর্স অর্থাৎ আয়ের উৎস থাকতে হবে।
• ভালো CIBIL স্কোর থাকতে হবে। এই স্কোর সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংকের (Bangladesh Bank) পক্ষ থেকে দেওয়া হয় লেনদেনের উপর ভিত্তি করে। লেনদেন যত ভালো তার স্কোর তত বাড়বে। যা কিনা ভবিষ্যৎ লোন ও বিভিন্ন সুবিধা পেতে সহায়ক হবে।
• চাকরিজীবের ক্ষেত্রে পে স্লিপ (Pay Slip) অথবা স্যালারি সার্টিফিকেট (Salary Certificate) ও ৩ মাসের ব্যাংক বেতনের স্টেটমেন্ট (Bank Statement)।
• ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে অবশ্যই ট্রেড লাইসেন্স (Trade License) ও ৩ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে হবে।
উপরোক্ত শর্ত পূরণ হয়ে গেলে আপনার নিকটস্থ শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলে খুব সহজেই সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন।
যারা চাকরি বা বিজনেস করেন না তাদের জন্য ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার উপায়
অনেকেই আছেন যারা কিনা ছোট চাকরি করেন কিংবা এই মুহূর্তে বেকার আছেন অথবা আর নিজের কোন বিজনেসও নেই। তাদের জন্যও সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার উপায় এখন আলোচনা করব। এক্ষেত্রে সঞ্চয়ী হিসেব বা সেভিংস একাউন্টে (Savings Account) ৬০ হাজার টাকা ডিপোজিট বা ডিপিএস করলে নির্দিষ্ট লিমিটে একটি ক্রেডিট কার্ড পেতে পারেন। এই ক্ষেত্রে কোন ধরনের পে স্লিপ, সেলারি সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ট্রেড লাইসেন্স জমা দিতে হবে না।
সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের চার্জ ও অন্যান্য বিষয়
প্রতিটি সার্ভিসেরই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চার্জ রয়েছে। এই চার্জের আবার কয়েকটি ক্যাটাগরি রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্যাশ উত্তোলনের চার্জ। ক্রেডিট কার্ড হতে টাকা উত্তোলন করলে সাধারণত ৪৫ দিন পর্যন্ত ইন্টারেস্ট ফ্রি (Interest Free) সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ টাকা তোলার পর নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেও সেটি পরিশোধ করলে কোন ধরনের সুদ বা বাড়তি টাকা দিতে হয় না।
উদাহরণস্বরূপ আপনি আজকে মাসের ১ তারিখে ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করবেন। আপনি যদি এরপরের মাসের বিলিং ডেট বা বিল পরিশোধের মেয়াদের আগেই এই টাকা পরিশোধ করেন তাহলে কোন ইন্টারেস্ট দিতে হবে না। আর যদি সেই মেয়াদ পার হয়ে যায় তাহলে ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণে ইন্টারেস্ট বা চার্জ প্রযোজ্য হবে।
সাধারণত মাসের ১৫ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে এই বিলিং ডেট নির্ধারিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ যে মাসে আপনি অর্থ উত্তোলন করবেন সেই মাস এবং পরের মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আপনি সময় পাবেন টাকা পরিশোধ করার।
আর কার্ড ব্যবহারের জন্য প্রতিবছর ১৫০০ টাকা চার্জ প্রদান করতে হয়। এছাড়াও গ্রাহকের ব্যবহার অনুযায়ী আরো কিছু চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে ভার্চুয়াল কার্ড ফি (Virtual Card Fee), এসএমএস চার্জ SMS Charge (২০০ টাকা), মেইল চার্জ ইত্যাদি।
তাছাড়া ব্যালেন্স জানার জন্য অথবা মিনি স্টেটমেন্ট (Mini Satement) নিতে চাইলে ৫ টাকা ফি প্রদান করতে হবে। এছাড়া একাউন্টের অন্যান্য সার্ভিস চার্জের প্রযোজ্য হয়। তবে চার্জের পরিমাণ যাই হোক না কেন সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা অনেক।
ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করতে কি কি কাগজ লাগে
• সদ্য তোলা ল্যাব প্রিন্ট পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি
• ভোটার আইডি কার্ডের রঙিন কপি
• ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স
• চাকরিজীবীদের জন্য আইডি কার্ড এবং পে স্লিপ
• ই টিন সার্টিফিকেট (ট্যাক্স যোগ্য ইনকাম থাকলে)
• প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক স্টেটমেন্ট
সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা
প্রায় সকল ব্যাংকের এই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেই নানা ধরনের সুবিধা উপভোগ করা যায়। চলুন এর ভালো এবং প্রয়োজনীয় দিকসমূহ জেনে নেই।
• যখন তখন অর্থ উত্তোলন করা যায়
• নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে সুদ মুক্ত লোন নেওয়া যায়।
• সময়মতো লোন পরিষদের মাধ্যমে ক্রেডিট স্কোর বাড়ানো যায়।
• অনলাইন হতে পণ্য ক্রয় করা যায়
• কেনাকাটায় ডিসকাউন্ট অফার পাওয়া যায়
• জরুরী প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক লোন পাওয়া যায়
• নগদ অর্থ বহনের কোনো ঝুঁকি থাকে না
এছাড়াও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং ডেক্সটপ ভার্সনের মাধ্যমেও অনলাইনে অর্থ লেনদেন করা যায়। City Bank Credit Card এর পক্ষ থেকে সারা দেশজুড়ে প্রায় ৫ শতাধিক মার্চেন্ট এবং ৩৩০০ এর বেশি আউটলেটে নানা অফারে কেনাকাটা করার সুযোগ রয়েছে। ঈদ, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি উপলক্ষে রয়েছে বিশেষ ডিসকাউন্ট ও ক্যাশব্যাক অফার। সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা গুলোর মধ্যে আরো রয়েছে তারা বেশি রেস্টুরেন্টের পেমেন্টে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সেভিংস। বিভিন্ন জনপ্রিয় অনলাইন মার্চেন্ট গুলোতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সেভিংসে ফুড ডেলিভারির সুবিধা এবং ৪০ টিরও বেশি রেস্টুরেন্টে ডিনার এবং রমজান উপলক্ষে ইফতার অফার।
ক্রেডিট কার্ডের অসুবিধা কি
• সাধারণত সুদের হার অনেক বেশি থাকে। সময় মত বিল পরিশোধ না করলে সুদের পরিমান বাড়তে থাকে।
• যখন তখন টাকা উত্তোলন করার সুযোগ থাকে বলে বাড়িতে খরচ এবং ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
• সময় মত বিল পরিশোধ না করতে পারলে জরিমানা এবং বাড়তি চার্জ দেওয়া হয়।
• ক্যাশ টাকা উত্তোলনের উপর ফি দিতে হয়।
• অনেক সময় অনলাইন জালিয়াতি কিংবা প্রতারণার শিকার হয়ে বড় অঙ্কের টাকা লস হতে পারে। তবে ব্যাংক সেকল ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিয়ে থাকে।
• যেহেতু চাইলেই কেনাকাটা করা যায় তাই অনেকেই অপ্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করে এবং ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
ক্রেডিট কার্ডের লিমিট ও বাৎসরিক চার্জ
সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বাৎসরিক চার্জ ১৫০০ টাকা। ধরণ ভেদে চার্জ ভিন্ন হতে পারে। কোন কোন ব্যাংকের এই চার্জ তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা বা আরো বেশি। এটি সম্পূর্ণ ব্যাংকের নীতিমালার উপর নির্ভর করে। ক্রেডিট কার্ডের লিমিট (City Bank Credit Card Limit) ও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
একাউন্টের ধরন, গ্রাহকের ইনকাম ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে একটি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ৫০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যায়।
ক্রেডিট কার্ডের মিনিমাম ডিউ কি | Credit Card Minimum Due
আশা করি সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার উপায় বা যোগ্যতা সম্পর্কে আপনাদের সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। অনেকেই আবার ক্রেডিট কার্ডের মিনিমাম ডিউ সম্পর্কেও জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মিনিমাম ডিউ হচ্ছে কার্ড হতে অর্থ উত্তোলনের পর নির্দিষ্ট একটি অ্যামাউন্ট যা কিনা আপনাকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এই মিনিমাম অর্থটি পরিশোধ না করলে ক্রেডিট স্কোর খারাপ হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে সাধারণত ৫% পর্যন্ত শুধু ফি ধার্য হতে পারে।
কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই সচেতনতা গুলো অবলম্বন করা উচিত। এতে করে একদিকে যেমন ক্রেডিট স্কোর রক্ষা করা যায় অপরদিকে সুদের বোঝা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।

জি আমি একটা ক্রেডিট কার্ড করতে চাই
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে পছন্দের ব্যাংকে যোগাযোগ করুন,পেয়ে যাবেন ইনশাল্লাহ
সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে অন্যান্য ব্যাংকে চেয়ে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়
Created lagbe