আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে যে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না। যদিও কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় তবুও দেহের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি একবার নষ্ট হয়ে গেলে পোহাতে হয় অনেক ঝামেলা। প্রতিনিয়ত অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন যে ঘর বসে দাঁত সাদা করার উপায় কি? যদি এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিতে যদি হলদে কিংবা কালচে ভাব থাকে তাহলে হাসির সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
অনেকেই আবার নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার করলে হলদে ভাব থেকে যায়। অফিস, পারিবারিক অনুষ্ঠানে ইত্যাদি স্থানে নিজেকে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী রাখার জন্য অবশ্যই ঝকঝকে দাঁত প্রয়োজন। চলুন ঘরোয়া পদ্ধতিতে কিভাবে এই সমস্যাটির সমাধান করতে হবে।
দাঁতে হলদে ভাব হওয়ার কারণ কি
• নিয়মিত অর্থাৎ দুই বেলা ব্রাশ না করা
• অতিরিক্ত ধূমপান এবং চা-কফি পান করা
• চিনি জাতীয় খাবার গ্রহণের পর দাঁত পরিষ্কার না করা
• যাদের কম পরিমাণে লালা নিঃসৃত হয়
• বয়সের কারণেও এই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়
ঘরে বসে দাঁতের হলুদ দাগ সাদা করার উপায়
নিম্নে আমি কয়েকটি পদ্ধতি আলোচনা করব। এগুলোর যেকোনো একটি অবলম্বন করেই আপনি পেতে পারেন ঝকঝকে সুন্দর দাঁত। চলুন কথা না বাড়িয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
হলুদ ব্যবহার করে দাঁত সাদা করবো কিভাবে
রুপ চর্চার কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এই উপাদানটি। এমনকি বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতেও ব্যবহৃত হওয়া এই উপাদানটি দিয়ে খুব সহজেই আপনার মুখের দাঁতগুলোকে ঝকঝকে করতে পারেন। এর জন্য আপনাকে নিম্নোক্ত ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
• ৪ টেবিল চামচ পরিমাণ হলুদের গোঁড়া নিন
• ২ টেবিল চামচ পরিমাণ বেকিং সোডা নি
• বিশুদ্ধ নারিকেল তেল প্রয়োজন হবে ৩ টেবিল চামচ
উপরের উপাদানগুলো একত্রে মিশ্রিত করে একটি পেস্ট তৈরি করুন। এই মিশ্রণটি আপনি চাইলে কয়েকদিনের জন্য ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে পারবেন। আবার চাহিদা মত কোন একটি উপকরণ কম কিংবা বেশি দিয়েও ব্যবহার করতে পারবেন। তবে সবচাইতে ভালো হয় প্রতিবার ব্যবহারের সময় নতুন করে বানিয়ে নিলে।
ব্যবহারবিধি
হলুদের গুড়ার এই মিশ্রণটি ব্যবহার করার করার জন্য একটি টুথপেস্টের সাথে ২ চামচ পরিমাণ মিশ্রণ লাগিয়ে নিন। তারপর মুখের ভেতরের অংশগুলো খুব যত্ন সহকারে অন্ততপক্ষে ১ থেকে ২ মিনিট ব্রাশ করুন। ব্রাশ করা হয়ে গেলে ১ টেবিল চামচ পরিমাণ নারিকেল তেল মুখের ভেতরে নিয়ে কলি করুন। এই তেলের সাহায্যে আপনার মুখের ভেতরের সকল জীবাণু বাইরে চলে আসবে। তবে খেয়াল রাখবেন কোনভাবেই যেন তেল কিংবা মিশ্রণ পেটের ভেতরে চলে না যায়। মুখের জীবাণু পেটের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। এভাবে অন্ততপক্ষে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন ব্যবহার করুন।
তবে খেয়াল রাখবেন হলুদ মুখের বিভিন্ন অংশে লেগে যেতে পারে। এর জন্য পরবর্তীতে আলাদা ব্রাশ ব্যবহার করে মুখের ভেতর অংশ পরিষ্কার করে নিতে পারেন।
উপকারিতা
নারিকেল তেলের মধ্যে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান আমাদের মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া দূর করার পাশাপাশি মাড়ির সমস্যার সমাধান করে। দাঁতের ভিতরে শিনশিন অনুভব করা, দাঁত খসে যাওয়া সমাধান আর দুর্গন্ধ দূর করে। আর প্রাকৃতিক ভাবে দাঁত সাদা করার উপায় হিসেবে বেকিং সোডা জনপ্রিয়। এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম বাই কার্বনেট। কোন কিছু গভীর থেকে পরিষ্কার করার পাশাপাশি এটি যেকোনো ধরনের কালচে এবং হলদে দাগও দূর করতে পারেন।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলুদ শরীরের জীবাণু ধ্বংস করে এবং ইনফেকশন দূর করতে কার্যকরী।
তেজপাতা দিয়ে যেভাবে দাঁত সাদা করার উপায়
আপনি নিশ্চয়ই শুনে অবাক হচ্ছেন যে তেজপাতা দিয়ে কিভাবে ঝকঝকে দাঁত পাওয়া যায়। শুধুমাত্র রান্নার কাজে যে এটি লাগে বরং তা নয়। এটা দিয়ে মুখের দুর্গন্ধ দূর, মাড়িতে ব্যথা সমাধানসহ ঝকঝকে দাঁতও পেতে পারেন। এজন্য আপনাকে আরো কয়েকটি উপাদান প্রয়োজন হবে। সেগুলি হল
• কমলা অথবা লেবুর শুকনো খোসা
• দুই থেকে তিনটি লবঙ্গ
কিভাবে ব্যবহার করবেন
এই পদ্ধতিতে প্রথমেই আপনাকে ৩ থেকে ৪ টি শুকনো তেজপাতা নিতে হবে। একই সাথে লেবুর খোসা এবং লবঙ্গ গুড়া করে মিশ্রিত করতে হবে। সামান্য পানি মিশিয়ে উত্তম মিশ্রণটি দিয়ে দাঁত মাজতে পারেন। ঝকঝকে এবং সুন্দর দাঁত পাওয়ার জন্য সপ্তাহে অন্ততপক্ষে ২ থেকে ৩ দিন এই পদ্ধতিতে দাজি মাধ্যম।
অ্যাপল সিডার ভিনেগারের মাধ্যমে দাঁত সাদা করার উপায়
জীবাণু ধ্বংস করার জন্য অ্যাপেল সিডার ভিনেগার খুবই জনপ্রিয়। এর পাশাপাশি এটি দাঁতের ময়লা দূর করে দাঁতকে করতে পারে অনেক বেশি সাদা ও উজ্জ্বল। এর জন্য এক কাপ পানির সাথে ১ চা চামচ ভিনেগার মিশ্রিত করতে হবে।
মিশ্রণটি তৈরি হয়ে গেলে পানি মুখে নিয়ে কয়েক মিনিট কুলকুচি করতে হবে। এভাবে কিছুক্ষণ করার পর খালি পানি দিয়ে মুখের ভেতরে অংশ ধুয়ে ফেলুন। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এই পানিটি যেন পেটের ভেতরে প্রবেশ না করে। যাদের মুখে দুর্গন্ধ রয়েছে তারা অন্ততপক্ষে সপ্তাহে ১ দিন এই উপায়টি অবলম্বন করতে পারেন।
দাঁত ঝকঝকে রাখার জন্য লেবুর খোসা অথবা কমলার ব্যবহার
আমরা আগেও একবার জেনেছি কমলার খোসা ব্যবহার করে দাঁত পরিস্কার রাখা যায়। প্রথমে কমলার খোসা অথবা গলার খোসা নিয়ে ছোট ছোট করে টুকরো করে নিন। তারপর খোসার ভেতর এর সাদা অংশটুকু দিয়ে দাঁতের উপর প্রলেপ দিন। এভাবে ১০ মিনিট রেখে দেওয়ার পরে মুখ ব্রাশ করে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। ঘরে বসে দাঁত সাদা করার উপায় গুলোর মধ্যে এটি সবচাইতে সহজ। সপ্তাহে ২ দিন এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে ভালো ফলাফল পেতে পারেন।
কয়লা দিয়ে দাঁত সাদা করার পদ্ধতি
গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ কয়লা দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করে। কাঠ পোড়ানো কয়লা দিয়ে দাঁত ঘষলে খুব সহজে সেটাই চকচকে হয়ে যায়। এই পদ্ধতিটিও খুবই সহজ।
প্রথমে কিছু পরিমাণ কয়লার গুড়ো করে নিয়ে নিতে হবে। তারপর হাতের আঙ্গুল ব্যবহার করে সেই গুড়া কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে হবে। এক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে কয়লা যেন যেন মুখের ভেতরে প্রবেশ না করে। দুই মিনিট এভাবে ব্রাশ করে মুখ পরিষ্কার করলে আপনি নিজেই অনুভব করতে পারবেন দাঁত কতটা পরিস্কার হয়েছে।
স্বাস্থ্য সচেতনতায় অন্যান্য কিছু কথা
উপরে উল্লেখিত পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত গবেষণায় প্রমাণিত এরকম নয়। প্রাকৃতিক বা ঘরোয়া এই বিষয় প্রাচীনকাল থেকেই দেশের মানুষ অনুসরণ করে আসছে। যেহেতু সম্পূর্ণ ভেষজ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তাই এর কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই এবং চাইলে নিজে নিজেই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। তবে সুস্থ দাঁত রাখার জন্য অবশ্যই কিছু নিয়মকানুন জানা জরুরী। সেগুলো হল
• সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমানোর আগে অন্ততপক্ষে ২ বার ব্রাশ করতে হবে। আরো ভালো হয় যদি দিনের বেলা ভারি খাবার খাওয়ার পর দাঁত পরিষ্কার করে নেয়া।
• মাছ মাংস খাওয়ার পর দাঁতের কোনায় খাদ্য কোন আটকে থাকে। তাৎক্ষণিকভাবে এগুলো পরিষ্কার করা দাঁতের জন্য ভালো।
• চিকন বা সুইয়ের মত কোন কিছু দিয়ে যাতে না খোঁচানাই উত্তম। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে মাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
• অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি জাতীয় খাবার শরীর এবং দাঁত কোনটির জন্য ভালো নয়।
• প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর ব্রাশ পরিবর্তন করা উচিত।
• প্রতিবছরই অন্তত ১ বার দাঁতের ডাক্তারের কাছে গিয়ে ভালোভাবে চেকআপ করে নেওয়া প্রয়োজন। যদি কোন সমস্যার সৃষ্টি হতে থাকে তাহলে সেটি আগে থেকেই বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।
আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন ঘরোয়া পদ্ধতিতে দাঁত সাদা করার উপায় কি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পেস্ট। সব সময় চেষ্টা করবেন ভালো মানের পেস্ট ব্যবহার করার। দাঁত যদি সুন্দর এবং চকচকে থাকে তাহলে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যাবে।
