কাদের উপর কোরবানির ফরজকোরবানির পশু কেমন হওয়া দরকার

মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি দেওয়া একটি পবিত্র ইবাদত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা প্রতি বছর জ্বিলহজ মাসে পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ নিয়ে আবার নানাজানের মধ্য নানা ধরনের প্রশ্নও থাকে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিত। গৃহপালিত পশুর মধ্যে ছাগল, ভেড়া, গরু, মহিষ, উট, দুম্বা কোরবানি দেওয়া যায়।

তবে এ সকল পশু জবাই করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়মও রয়েছে যা আমাদেরকে অবশ্যই মানতে হবে। তা না হলে কোরবানির শুদ্ধ নাও হতে পারে।

কাদের উপর কোরবানির ফরজ

হানাফী মাযহাব মতবাদ অনুযায়ী প্রত্যেক বিবেকবান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য এটি ফরজ। তবে এর জন্য অবশ্যই যথাযথ পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকার পরে যে কোন মুসলমানের উপরেই কোরবানী বাধ্যতামূলক। প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম যারা কিনা বয়সন্ধিতে পৌঁছেছে, কোন ভ্রমণ করছেন না, অতিরিক্ত বা নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কোরবানি দিতে হবে। মিসাব পরিমান সম্পদ হচ্ছে ৮৭.৪৭ গ্রাম সোনা বা ৬১২.৩৬ গ্রাম রুপা অথবা তার অধিক পরিমাণ সম্পদ।

কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিত

এ নিয়ে আমরা অনেকেই সংশয়ে ভূগে থাকি। বাংলাদেশ ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাপটে গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা, উট এ সকল গৃহপালিত পশু প্রাণীকে কুরবানী দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মও রয়েছে। চলুন সবার আগে জেনে নেই কোরবানির পশুর বয়স কেমন হতে হবে।

• ভেড়া, ছাগল কিংবা দুম্বার ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে ১ বছর বয়স হতে হবে। একটি ভেড়া, ছাগল কিংবা দুম্বা একজন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হবে।

• গরু, মহিষের ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে ২ বছর হতে হবে এবং একটি গরু কিংবা মহিষ দ্বারা ৭ জন কোরবানি দিতে পারবেন।

• উট কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে এটির বয়স সর্বনিম্ন ৫ বছর হতে হবে এবং একই সাথে ৭ জন এতে কোরবানি দিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

• যেই পশুকে বাছাই করা হবে সেটি খুব বেশি শুকনা এবং চর্বিবিহীন হতে পারবে না।

• জ-বাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম এমন প্রাণীর দ্বারা কোরবানি দেওয়া যাবে না।

• দাঁত নেই অথবা অর্ধেকের বেশি দাঁত অনুপস্থিত এমন পশু হলেও কোরবানির জন্য জায়েজ হবে না।

• সম্পূর্ণভাবে অন্ধ কিংবা একটি চোখ নেই এমন পশু দিয়ে কুরবানী দেওয়া যাবে না।

• কোন পা যদি খোঁড়া থাকে অথবা ঘুড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে তাহলে সেটি দিয়েও হবে না।

পশুর চামড়া খাওয়া কি হালাল

সাধারণত বিভিন্ন পশু প্রাণীর চামড়া দিয়ে মানুষের ব্যবহার করার পণ্য তৈরি করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জুতা, বেল্ট, ব্যাগ ইত্যাদি। এমনকি এই সকল চামড়া থেকে জিলাটিন নামক পদার্থটি বের করে খাদ্য এবং ওষুধ সামগ্রী তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে আমরা ফেসবুক, ইউটিউব সহ নানা প্ল্যাটফর্মে দেখে থাকি যে এ সকল পশুর চামড়া প্রসেস করে মজাদার রেসিপি তৈরি করা হচ্ছে।

জানিয়ে অনেকের মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে পশুর চামড়া খাওয়া কি হালাল কিনা। এর উত্তর হল জ-বা-ইকৃত হালাল পশুর প্রবাহিত রক্ত ছাড়া অন্যান্য সবই হালাল। ঠিক যেমনিভাবে আমরা গরুর ভুড়ি খেয়ে থাকে। ঠিক তেমনি ভাবে চামড়া খাওয়া হালাল।

তবে কেউ চাইলেই খেতে পারবে আবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মনে হলে বিরত থাকতে পারবে।

ইসলাম ধর্মে হালাল পশুর সাতটি অঙ্গ খাওয়ার ব্যাপারে নাজায়েজ বা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই ৭ টি অঙ্গের মধ্য হলো

১। পশুর প্রবাহিত রক্ত
২। পশুর অন্ডকোষ
৩। চামড়ার মধ্যে জমাট বাধা মাংস গ্রন্থি
৪। পশুর মূত্র থলি
৫। পিত্তথলি
৬। নর প্রাণীর পুলিঙ্গ
৭। মাদি পানির স্ত্রীলিঙ্গ

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে আমাদের প্রিয় নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম বকরির ৭ টি জিনিস অপছন্দ করতেন। অতএব কেউ যদি হালাল পশুর চামড়ার প্রসেস করে খেতে চায় তাহলে তার জন্য অবশ্যই সেটি হালাল হবে। অথবা সদগা করে দিতে পারেন। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সা.) কোরবানির পশু জবাই করতে, পশুর গোশত, চামড়া ও নাড়ি ভুড়ি সদকা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। এমনকি এ সকলের কোন কিছু কসাইকে দিতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী: ১৭১৭, মুসলিম: ১৩১৩)

আপনারা এখন ২ টি বিষয় সম্পর্কে ইতিমধ্যে অবগত হয়েছেন যার মধ্যে একটি হচ্ছে কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিত এবং অপরটি হচ্ছে পশুর চামড়া হালাল কিনা। সেই সাথে আপনারা আরো জেনেছেন কোরবানির পশুর বয়স কেমন হওয়া উচিত।

কোরবানির গোশত বিতরণের নিয়ম কি

আলেমগণ পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম হিসেবে সমান ৩ ভাগে ভাগ করার পর আমার সাথে। তারপর সেই তিনভাগের এক ভাগ নিজের এবং পরিবারের জন্য অপর এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য এবং অপর ভাগ্যে গরিব এবং দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করতে বলেছেন। সারা বিশ্বজুড়ে অনেক মুসলমান রয়েছে যারা কিনা তাদের কোরবানি সুবিধা বঞ্চিত সম্প্রদায় বা মানুষগুলির মাঝে করতে পছন্দ করেন। তারপর সেই মাংসের পুরো অংশটাই দরিদ্র এবং দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করে দেন।

কারা কারা কোরবানির গোস্ত পাবেন

এই মাংস বিতরণ করার জন্য সঠিক প্রাপক নির্ধারণ করা জরুরী। যাদের মধ্যে রয়েছে

• যে পরিবার সবচাইতে কম অর্থ আয় করে
• পরিবারের প্রধান মহিলা।
• শারীরিকভাবে অক্ষম প্রতিবন্ধী অথবা বয়স্ক ব্যক্তিদের পরিবার
• পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু
• গর্ভবতী মহিলা
• যে মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান
• পরিবারের সদস্যদের আয় খুবই সীমিত বা ক্রয় ক্ষমতা কম।

কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম কি

কোরবানির মাংস বন্টনের ক্ষেত্রে গরীব দুঃখীতে এবং আত্মীয়দের মাঝে বিতরণ না করাটা খুবই গর্হিত কাজ। এতে একজন মুসলমানের কৃপণতা প্রকাশ পায়। কারণ এই মাংস বিতরণের মাধ্যমে কোরবানি দাতা নিজেকে অহংকার থেকে নিরাপদে রাখতে পারেন।

তাইতো কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিত এবং মাংস বন্টনের নিয়মগুলো আমাদের জানার অত্যন্ত জরুরী। এই কারণ আমরা এই ইবাদতটি করে থাকি মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। তাই এই প্রচেষ্টা যেন মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হয় তার জন্য সকল নিয়ম কানুন মানতে হবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *