মানবদেহে পরজীবের সংক্রমণ একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। যা কিনা সঠিক নিয়মে মেডিসিন গ্রহণ করার মাধ্যমে দূর করা যায়। তবে কৃমির ওষুধ খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা নিয়ে আমাদের মাঝে বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন অনেকেই মনে করে থাকেন যে মেঘলা, বৃষ্টি অথবা ঠান্ডা দিনে এই ধরনের মেডিসিন গ্রহণ করা ভালো। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন বৃষ্টির দিনেই কৃমির ওষুধ খেতে হবে এই ধরনের কোন ধরাবাঁধা নিয়ম বা উপকারিতা নেই।
সাধারণত কৃমির আকার বেশ ছোট হয়ে থাকে। আর যেহেতু দেহের অভ্যন্তরে থাকে তাই আমরা এগুলোকে দেখতে পাই না। তবে এর ক্ষতিকর দিক অনেক। আপনি শুনে অবাক হবেন যে একটি ছোট কৃমি আমাদের শরীর থেকে প্রতিদিন প্রায় ০.২ মিলিলিটার রক্ত শুষে নিতে পারে। তারমানে দেহের ভিতরে কিছু সংখ্যক কৃমি থাকলে বেশ খানিকটা রক্ত এমনিতেই হারিয়ে যায়। যার ফলে আমরা অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা ইত্যাদিতে ভূগতে থাকি।
এছাড়াও কৃমির কারণে এলার্জি, ত্বকের চুলকানি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি হতে পারে। আবার এই পরজীবীটি পিত্তথলির নালীতে আটকে গিয়ে বড় ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যা থেকে এড়ানোর জন্য সঠিক উপায়ে কৃমির ওষুধ খাওয়ার নিয়ম জানা উচিত।
কৃমি কেন হয় জেনে নিন
যে কোন সমস্যা দূর করার আগে সেটি প্রতিরোধ জানা সম্পর্কে ভালো। সাধারণত অস্বাস্থ্যকর, অনিরাপদ এবং নোংরা পরিবেশ, দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর খাবার, খালি পায়ে রাস্তাঘাটে হাঁটা, ইত্যাদি কারণে আমাদের দেহের কৃমির সংক্রমণ হয়ে থাকে। তবে চিন্তার কোন কিছু নেই শুধুমাত্র ওষুধের মাধ্যমেও এটি দূর করা যায়। এর জন্য মানতে হবে যথাযথ নিয়ম।
কিভাবে বুঝবেন তিনি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন
• খেতে অরুচি লাগতে পারে এবং অনেক ধরনের খাদ্য খাওয়ার প্রতি অনীহা আসতে পারে।
• মাঝে মাঝে পেট ব্যথা এবং পেটে কামড়ানো কৃমি সংক্রমনের লক্ষণ।
• অনেক সময় বমি বমি লাগতে পারে এবং পাতলা পায়খানা হতে পারে।
• মলদ্বারে চুলকানি হতে পারে এবং মাঝে মাঝে ব্যথা হতে পারে।
• ফিতা কৃমির আক্রমণে মানব দেহে রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়। কারণ এটি অন্ত্রে লেগে থাকে এবং রক্ত নষ্ট করে।
• অনেক সময় এটি শিশুর নাক মুখ অথবা মলদ্বার দিয়ে বের হতে পারে।
• পেট ফুলে যেতে পারে
• প্রাপ্তবয়স্কদের পেট কামড়ানো, আমাশয় ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে কথা বলে ওষুধ খেতে হবে।
কৃমির ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
• ডাক্তার আর পরামর্শ দিয়ে থাকেন যে প্রতি তিন মাস পর পর একটি পরিবারের সবাই অ্যালবেনডেজল ট্যাবলেট খাবার। মেবেনডাজল হলে এইটা না তিন দিন খেতে হবে। অবশ্য চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সাত দিন পর আরও একটি ট্যাবলেট খাওয়া যায়। একই নিয়মে বাসার শিশুদেরকেও সিরাপ খাওয়াতে হবে। তবে বাচ্চার বয়স যদি ২ বছরের কম হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছ থেকে শুনে তারপরে খাওয়ানো উচিত।
যেহেতু এটি একটি সংক্রমণ রোগ তাই পরিবারের একজনের কাছ থেকে বাকি সদস্যদের কাছে এটি সংক্রমিত হতে পারে। সেজন্যই চিকিৎসকরা পরিবারের সব সদস্যদেরকে একসাথে মেডিসিন খাওয়ার পরামর্শ দেন।
• গরমের দিনে কিংবা প্রচন্ড রৌদ্রে এই ধরনের মেডিসিন খাওয়া যাবেনা এর কোন সঠিক ভিত্তি নেই। তবে খাওয়ার পর কিংবা ভরা পেটে এই মেডিসিন খাওয়া ভালো।
যেকোনো ধরনের মেডিসিন খাওয়ার পরেই সাধারণত পানি পান করতে হয়। এতে করে ওষুধের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে সেটির দ্রুত কাজ করে।
কতদিন পর পর কৃমির ওষুধ খেতে হয়
সাধারণত তিন মাস পর পর এই মেডিসিন গ্রহণ করতে হয়। পরিবারের সব সদস্যদের একসাথে মেডিসিন গ্রহণ করা ভালো। তবে গর্ভাবস্থায় মহিলাদের এটি খাওয়া যাবেনা। তাছাড়া অন্য কোন শারীরিক জটিলতা বা অসুখ থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তারপর সেবন করতে হবে।
কৃমির আক্রমণ প্রতিরোধের উপায়
• আমাদের সমাজে আরো একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে চিনি কিংবা মিষ্টি খেলে কৃমি হয়। কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বরং অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশের কারণে এটি হয়ে থাকে। তাই বাসা এবং তার আশেপাশের পরিবেশ সবসময় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।
• সাধারণত এই পরজীবীর আক্রমণ হলে পায়ু পথ চুলকাতে থাকে। শিশুরা সেটার না বুঝে পায়ুপথ চুলকে সেই হাত দিয়ে অন্যান্য কাজ করে কিংবা মুখে দেয়। এতে করে কৃমি সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই তাদেরকে এ বিষয়ে যথাযথ সচেতন করুন।
• বাইরের খোলা খাবার না খাওয়াই ভালো। বাসার শিশুদেরকে মাঠে খালি পায়ে খেলতে দিবেন না।
• বাইরে থেকে বাসায় আসার পর কিংবা বাথরুম থেকে বের হওয়ার পর অবশ্যই দুই হাত সাবান দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করা উচিত।
• নিয়মিত বাথরুম, ব্যবহার্য কাপড়, রান্নাঘর, সিঁড়ি, ফ্লোর, ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করা উচিত।
• বিছানার চাদর নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। তাছাড়া হাতের নক নিয়মিত ছোট করা উচিত কারণ এখানে অনেক জীবাণু লেগে থাকতে পারে।
• জায়গায় খালি পায়ে হাটা ঠিক নয়।
মেডিসিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
কৃমির ওষুধ খাওয়ার নিয়ম আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন। তবে যেকোনো ধরনের মেডিসিন এ ডাক্তারের সাজেশন ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। মেডিসিন খাওয়ার পর সাধারণত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। মাথা ঘোরা, পেটে ব্যথা হওয়া, গ্যাস হওয়া, বমি হওয়া, অল্প ক্লান্তি অনুভব করা ইত্যাদি উপসর্গ যদি খুব বেশি গুরুত্ব না হয় তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
আমাদের শেষ কথা
যেকোনো সমস্যা ঘটার আগে সেটি প্রতিরোধ করায় সবচাইতে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। এতে করে নিজে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যায়। তাইতো জীবনের নানা ধরনের সমস্যার সমাধানের উপায় গুলি জানতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
