“প্রবাসীদের কষ্টের কথা” শুধুই একটি বাক্য নয়, এটি একটি বাস্তবতা, একটি অনুভবের নাম। যারা নিজের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ফেলে দেশের বাইরে রুটি-রুজির সন্ধানে গিয়েছেন, তারা জানেন এই কষ্টের প্রকৃত রূপ কতটা কঠিন।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ উন্নত জীবনের আশায় মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে এই যাত্রা কখনোই সহজ নয়। চাকরি, বাসস্থান, ভাষা, সংস্কৃতি, বৈষম্য—সবকিছু মিলিয়ে প্রবাসীদের জীবন একটি যুদ্ধক্ষেত্র।
প্রবাসজীবনের শুরুটা কেমন হয়?
প্রবাস জীবনের শুরু হয় হাজারো স্বপ্ন নিয়ে। অনেক সময় জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে বা ধার করে টিকিট কেটে কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমান। অথচ গন্তব্যে পৌঁছেই বাস্তবতার নির্মম রূপ দেখতে হয়—নির্ধারিত কাজ নেই, কোম্পানি প্রতিশ্রুতি মানে না, আবার কখনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দিন কাটে ভয় আর উদ্বেগে।
কর্মস্থলে বৈষম্য ও কষ্ট
১. অতিরিক্ত শ্রম
প্রবাসীরা সাধারণত কন্সট্রাকশন, ক্লিনিং, সিকিউরিটি, হোটেল, ডেলিভারি, কিংবা গার্মেন্টসে কাজ করেন। তাদের অনেককে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়, কখনো কোনো ছুটির সুযোগ ছাড়াই।
২. স্বল্প বেতন
একই কাজের জন্য বিদেশিদের চেয়ে বাংলাদেশিদের বেতন অনেক কম। অনেক সময় ঠিকমতো বেতনও দেওয়া হয় না। কিছু মালিক টাকা মেরে দেয় বা মাসের পর মাস বেতন আটকে রাখে।
৩. কাজের ঝুঁকি
অনেক প্রবাসী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে, যা জীবন ও শরীর দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আবাসন সমস্যা
অনেক প্রবাসী ছোট একটি রুমে ৮–১০ জন মিলে থাকেন। বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, রান্নার ব্যবস্থা—কিছুই থাকে না। অনেকের ঘুমানোর জায়গা পর্যন্ত নেই, তারা মেঝেতে পত্রিকা বিছিয়ে ঘুমান।
পরিবার থেকে দূরে থাকা মানে মানসিক যন্ত্রণা
১. মনের কষ্ট
সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো প্রিয়জনদের ছেড়ে থাকা। সন্তানের মুখ দেখা হয় না মাসের পর মাস। বাবা-মার অসুস্থতার খবরে অস্থির হয়ে থাকেন প্রবাসীরা, অথচ কাছে গিয়ে দেখার সামর্থ্য বা সময় থাকে না।
২. একাকীত্ব
ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন অনেকে। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার মানুষও থাকেন না। এই একাকীত্ব থেকে অনেক সময় মানসিক রোগ, এমনকি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন কেউ কেউ।
অর্থ পাঠানোর চাপ ও দেশে প্রত্যাশার বোঝা
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু এর পেছনের কষ্ট কেউ দেখে না। পরিবারের চাহিদা, সমাজের দৃষ্টি—সব মিলিয়ে প্রবাসীরা হয়ে ওঠে একধরনের “মানব এটিএম মেশিন”। অথচ তারা নিজের প্রয়োজন বা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন না।
স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার অভাব
বেশিরভাগ প্রবাসীর নেই স্বাস্থ্যবিমা বা স্থায়ী চিকিৎসা সুবিধা। অসুস্থ হলে নিজ খরচে চিকিৎসা নিতে হয়, যা অনেক সময় সম্ভব হয় না। অসুখে, দুঃখে, দুর্ঘটনায় সাহায্য করার কেউ থাকে না। আইনগত সহায়তা পাওয়া আরও কঠিন।
দেশে ফেরার সময়েও অপমান
প্রবাসীরা যখন দেশে ফেরেন, তখনও তাদের দৃষ্টিতে দেখা হয় শুধুই টাকার থলি হিসেবে। অনেকে ধরে নেয় যে তিনি “অনেক টাকা” নিয়ে ফিরেছেন। এই ভুল ধারণা থেকে পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে অযৌক্তিক চাপ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়।
প্রবাসীদের অবদান
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। ২০২৪ সালে প্রবাসীরা প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। প্রবাসীরা শুধু অর্থই পাঠান না, দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করেন।
কীভাবে কমানো যায় প্রবাসীদের কষ্ট?
১. দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ
বিদেশে পাঠানোর আগে সরকারিভাবে দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ভালো চাকরি পান।
২. দূতাবাসের সহযোগিতা
প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
৩. আইনগত সহায়তা
কোনো দেশেই প্রবাসীরা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চুক্তি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা
অনলাইন কাউন্সেলিং, হটলাইন ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্মান দিন, মানবিকতা দেখান
প্রবাসীদের কষ্টের কথা আমরা যত বেশি জানবো, তত বেশি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারবো। তারা আমাদের ভাই, আমাদের আপনজন। শুধু টাকার কারণে নয়, তাদের সম্মান করা উচিত তাদের ত্যাগের কারণে।
প্রবাসীদের কষ্টের কথা শুধু প্রবন্ধে লেখার বিষয় নয়, এটি আমাদের সচেতনতা ও মানবিকতার অংশ হওয়া উচিত। তাদের বাস্তবতা উপলব্ধি করে, সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে এগিয়ে আসাই হোক আমাদের দায়িত্ব।
একটি দেশ প্রবাসীদের ভালোবাসতে শিখলে, সে দেশের ভবিষ্যৎ আরও আলোকিত হয়।